Showing posts with label memoirs. Show all posts
Showing posts with label memoirs. Show all posts
মুঠোফোনের কল হিস্ট্রিতে শরীফ ভাইয়ের নাম কেন এতো বেশি- বিস্ময় প্রকাশ করেছিল সে। হাস্যকর প্রশ্ন! আসলে কেন যেন আমার ওপর এক ধরনের ব্যাখ্যাহীন সন্দেহ ছিল তার, সম্পর্কের প্রায় শুরু থেকেই। তুচ্ছ কারণে ঝগড়াঝাটি, মান-অভিমান তো বটেই, একসময় দেখা গেল, কারণে-অকারণে, সময়ে-অসময়ে আমার মুঠোফোনের কল হিস্ট্রি পরীক্ষা করা শুরু করল সে। যদিও এটা ছিল এই ধারায় নতুন সংযোজন। তবে সেই পরীক্ষায় আমি বরাবরই উৎরে গেছি। গোল বাঁধল সেদিন, আশুলিয়ার দিকে যাওয়ার জন্য সবেমাত্র বেরিয়েছি দুজন, আমার মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে হঠাৎ তার ফর্সা মুখ অন্ধকার হয়ে ওঠে। একবার আমার মুখের দিকে তাকায়, আরেকবার মুঠোফোনের স্ক্রিনের দিকে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, স্ক্রিনে অনেকগুলো ‌'শরীফ ভাই', যা ধারাবাহিক আলাপের সাক্ষ্য দিচ্ছে স্পষ্টই এবং সেটা আমার জানা। আমি নির্বিকার। তার উদাস চোখ যেন সড়কের ল্যাম্পপোস্ট গুণছে। অস্বাভাবিক দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে কাঁচতোলা গাড়ির ভেতরে।

নীরবতাও ভাঙে সে-ই, শীতল কন্ঠ তার, জিজ্ঞেস করে, এই শরীফ ভাইটা কে? আমি জবাব দেই, উনি আমার দুলাভাই। তার কন্ঠ একটু যেন চড়া মনে হল এবার- এতো আলাপ কিসের তার সঙ্গে? কল হিস্ট্রির অর্ধেকই তো তোমার শরীফ ভাইয়ের নাম! আমি জবাবে আবেগ, বলি তাকে, দেখো সন্দেহ করতে চাইলে করতে পারো। সেটা পুরোপুরি তোমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আমার বলার কিছু নেই। তবে মনে রেখো ভালোবাসা টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর।
সেই আবেগ তাকে স্পর্শ করে না, মুখ থেকে মেঘও নামে না। সে হঠাৎ জানতে চায়, আমি কি তোমার শরীফ ভাইকে কল করতে পারি একটা? অবাক হওয়ার পালা আমার। বলি, কী অদ্ভূত ইচ্ছা তোমার! হুট করে তুমি ফোন করলে উনি কী মনে করবেন সেটা ভাবো একবার? এবার তার কণ্ঠ চরম রূঢ় শোনায়, সিনেমার ভিলেনের মতো দাঁতে দাঁত চেপে উগড়ে দেওয়া স্বর- আমি তোমার শরীফ ভাইকে কল করবোই। ওভাবে অন্তরাত্মা কি সেদিনই প্রথম শুকিয়েছিল আমার?

কল সে ঠিকই করেছিল। লিমির নামটা সেইভ করা ছিল 'শরীফ ভাই' নামে। মুঠোফোনে কয়েকদফা ত্রিমুখী বাকযুদ্ধের ওই ঘটনার পর সে আর সম্পর্ক রাখেনি আমার সঙ্গে। এখনো মুঠোফোনের স্ক্রিনে আসল শরীফ ভাই, যিনি আমার আত্মীয়, তার নামটা যখন দেখি, মনে পড়ে যায় লিমির কথা। যদিও এখন তাকে বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেও দেখি কাগজে। তবে এতোকিছুর পরও সেই মেয়েটি কেন যেন আমাকে ছেড়ে যায়নি। আমিও তাকে সত্যিই ভালোবাসতাম। কিন্তু মানুষের মন আসলে এক বিচিত্র জিনিস অথবা হয়তো আমিই বিচিত্র। ওর সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে থাকতেই একইসঙ্গে আরো একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। আমি ওকেও অনেক ভালোবাসতাম। পরে আকস্মিক এক ঘটনায় দ্বিতীয়বারের মতো প্রায় একই কাণ্ড ঘটে। কিন্তু শত চেষ্টার পরও দুজনের কাউকেই বোঝাতে পারিনি, যদিও সেটাই ছিল সত্যি, আমি দুজনকেই সমান ভালোবাসতাম। এটা দ্বিচারণা ছিল না। কসম!


প্রথম প্রকাশ

এখন কী অবস্থা, জানি না। আগে হটমেইল একাউন্ট সহজে খোলা গেলেও এমএসএন ডোমেইনের (@msn.com) ইমেইল একাউন্ট সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। খুব সম্ভবত এটি শুধু মার্কিন মুল্লুকের জন্যই উন্মুক্ত ছিল। তবে এর বাইরে থেকেও খোলা যেতো। বিশেষ একটি কৌশল অবলম্বন করে abcdef@msn.com এর মতো ইমেইল একাউন্ট বহু খুলেছি একসময়। শুধু তাই নয়, হটমেইল ও এমএসএনের ইমেইল ঠিকানা ব্যবহার করে কিভাবে কিভাবে যেন বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠানের ডোমেইনের নামেও ইমেইল ঠিকানা খোলা যেতো। সে সময়, প্রায় এক যুগ আগের কথা, একটি আন্ডারগ্রাউন্ড ফোরামে দাবি করা হল যে, এটি হটমেইলের একটি বাগ এবং এই বাগের সুযোগ নিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো ইমেইল ঠিকানা নিতে পারেন যে কেউ। কয়েকটি মন্তব্যে দেখলাম, billgates@microsoft.com, steve@apple.com, mike@fbi.gov ইতিমধ্যে কেউ কেউ নিয়েছেন। লোভনীয় ব্যাপার, সন্দেহ নেই! ওই ফোরামেই এ সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ টিউটোরিয়াল পেয়ে কাজে নেমে পড়ি অচিরেই। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান খুঁজতে গিয়ে আমার প্রথমেই মনে এল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম। খালেদা জিয়া তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর লোক। তার কার্যালয় সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি ওয়েবসাইটও তখন চালু হয়েছে- www .pmo. gov .bd

ভাবলাম, খুলবো যখন, নিজের নামে খোলাই ভালো। দ্রুতই হটমেইলের নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন ফর্ম পূরণ করে নিচের দিকে কাঙ্খিত ইমেইল ঠিকানা দিয়ে দিলাম- myname@pmo.gov.bd. বারকয়েক ওকে-টোকে দিয়ে মাইক্রোসফটের প্রমোশনালে বাধ্যতামূলক সম্মতি জ্ঞাপন করে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি। উত্তেজনা ছিলই একটা স্বাভাবিকভাবে- প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নামে ইমেইল ঠিকানা পাওয়া সহজ ব্যাপার না! তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝলাম, ব্যাপারটা এতো সহজও না।

শেষ ধাপে যে ম্যাসেজটি পাওয়া গেল, তাতে মনের উত্তেজনা মাথায় উঠে গেল। ম্যাসেজে বলা হল, pmo.gov.bd ডোমেইনের কী এক ইমেইল ঠিকানায় আমার প্রাসঙ্গিক তথ্যসহ তারা একটি মেইল পাঠিয়েছে ভেরিফিকেশনের জন্য। বলা হল, যেন দ্রুত ওই মেইল চেক করে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি। কী আজব কান্ড! কথা তো এইরকম ছিল না! টিউটোরিয়ালেও ভেরিফিকেশনের কোনো উল্লেখ ছিল না। মেজাজ গেল বিগড়ে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবমাস্টার নিশ্চয়ই এই ইমেইল পাবেন। তাদের ডোমেইন ব্যবহার করে কেউ একজন ইমেইল একাউন্ট খোলার চেষ্টা করেছে- এটাও তাদের না বোঝার কথা নয়। তাছাড়া মেইলের সঙ্গে আমার আইপি যাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। আর আইপি পাওয়া গেলে আমাকে শনাক্ত করাও তাদের জন্য এমন কোনো ব্যাপার না।

ভয়ে ভয়ে কাটলো কয়েকটি দিন। জানতাম, চাইলে তারা আমার গর্দভসম কাজটাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়েও নিয়ে যেতে পারে আইনের মারপ্যাঁচে। তবে সৌভাগ্য আমার, দেশটির নাম ছিল বাংলাদেশ। এবং আল্লাহপাকের অসীম রহমতে সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ব্যাপারটি বুঝে উঠতে পারেনি!

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): হটমেইলপ্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়মেইলhotmailmsnprime minister's officemail ;

প্রথম প্রকাশ

সম্প্রতি আমার পুরো একমাসের ইন্টারনেট বিল গ্রামীণফোন হাপিস করে দিয়েছে। হাপিস হওয়ার এটা তৃতীয় ঘটনা। এর আগে একই কাণ্ড ঘটেছে আরো দুবার। তৃতীয় দফা ডাকাতির শিকার হওয়ার পর অনিচ্ছাসত্ত্বেও যোগাযোগ করি কাস্টমার কেয়ারে। অনেকক্ষণ অর্থহীন বাৎচিতের পর কর্তব্যরত কর্মী স্বীকার করলেন, ১৮ তারিখ বিল দিয়ে লাইন অ্যাকটিভ হওয়ার চার দিনের মাথায় আবার টাকা দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বিজনেস সলিউশনের ওই নাম্বার দিয়ে আমি শুধু ইন্টারনেটটাই ব্যবহার করি। ফোনকল-এসএমএস কিছুই করি না। করার কথাও নয়, কারণ সিমটি সবসময় মডেমের ভেতরেই ঢোকানো থাকে।

কাস্টমার কেয়ারের সুকন্ঠী ভদ্রমহিলা সেই গঁৎবাধা পরামর্শই দিলেন যথারীতি- আইটেমাইজড বিল বের করে নিকটস্থ কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আমি তাকে জানাই, টাকা মার গেছে। আপনি নিজেও বুঝতে পারছেন, গণ্ডগোল কিছু একটা হয়েছে। তাছাড়া আমার সময় নেই ম্যানেজারের কাছে ধর্না দেওয়ার। সবচেয়ে বড়ো কথা, এই মুহূর্তেই আমার ইন্টারনেট সংযোগ দরকার।
মেয়েটির কন্ঠে অপারগতা- তাহলে তো স্যার কিছুই করার নেই আমাদের।
আমার মেজাজ গেল চড়ে। আমি তাকে মুখের ওপর জানিয়ে দিলাম, গ্রামীণফোন হল ডাকাত। তারা গ্রাহকদের সঙ্গে ডাকাতিই করছে। মেয়েটি বলল, আপনি এতো বড়ো একটা কম্পানিকে ডাকাত বলছেন! আপনাকে এর প্রমাণ দিতে হবে। আমি বললাম, আমার নাম-ঠিকানা সবই আপনার চোখের সামনে। আমি দায়িত্ব নিয়ে গ্রামীণফোনকে ডাকাত বলছি। তাকে আবার জিজ্ঞেস করি, যে ফোন থেকে কোনো কল বা একটি এসএমএস পর্যন্ত করি না, ১৮ তারিখ সেই ফোনের বিল অগ্রিম পরিশোধ করার পরও ২২ তারিখে কেন আবার বিল দিতে হবে? মেয়েটি ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগের পুরনো গীত গেয়ে শোনায় পুনর্বার। আমি তাকে জানাই, যোগাযোগের সময় আমার নেই। ইচ্ছাও নেই।
মেয়েটি শেষমেশ আমাকে হুমকি দেয়, একটি নামকরা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আপনি যে ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজ করেছেন, সে ব্যাপারে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের অথরাইজড পার্সনকে কমপ্লেইন করবো।

শুনে ভয়ের বদলে বরং ভালোই লাগল এই ভেবে যে, ওই কর্মীকে একটু হলেও আঘাত দেওয়া সম্ভব হল। জানি, ওই কর্মী তার দায়িত্বই পালন করছেন। তবু নিরুপায় আমি। কর্মীকে আঘাত দেওয়া মানে স্বয়ং গ্রামীণফোনকেই আহত করা। হোক তা সামান্য। আমি শুধু বললাম, কমপ্লেইন করতে আপনার কতোক্ষণ লাগতে পারে? খুব ভালো হয়, যদি পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেটা করেন।

লাইন কেটে দিলাম এবং দীর্ঘ তিন বছর পর গ্রামীণফোনের সিমটি মডেম থেকে খুলে হেলাফেলায় রাখলাম এককোণে। ওই সিম আর কখনো সচল হবে না। বিদায় গ্রামীণফোন!

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): গ্রামীণফোনকেলেঙ্কারিপ্রতারণাইন্টারনেটজিপিআরএসমোবাইল ইন্টারনেটmobile internetgprsinternetscamgrameenphonegrameen phonefraud ;

প্রথম প্রকাশ

'ঠেলা না দিলে তো নিউজ দেন না!'
ভদ্রলোক সম্ভবত কোনো এক এনজিও থেকে এসেছিলেন। অফিসে ঢোকার মুখে কে যেন আমার দিকে ইঙ্গিত করলেন। মধ্যবয়সী ভদ্রলোক এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। পরিচয়পর্ব সম্পন্ন হল, অতি বিনয় দেখাতে গিয়ে নেমকার্ড বিনিময়ও হল। ভদ্রলোক একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিতে চান, তবে এমনি-এমনি নয়, দিতে চান হাতে-হাতে, যেন মিস না হয়। তবে তাই হোক! কম্পিউটারে কম্পোজ করা দেড় পৃষ্ঠার বিজ্ঞপ্তি নিলাম। মানিকগঞ্জ কি নারায়ণগঞ্জে তাদের প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার শাখা কার্যালয় পরিদর্শন সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। মনে মনে বলি, কার্যালয় পরিদর্শনের আবার বিজ্ঞপ্তি কী? তাও এক মধ্যম সারির কর্মকর্তার পরিদর্শন! তবে সেটা মুখে বলার প্রশ্নই আসে না। আকার-ইঙ্গিতে তাকে বোঝাই যে, এটা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউজ! এর ফল হল বিপরীত। ভদ্রলোক প্রেস বিজ্ঞপ্তি তুলে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলেন না, এবার হাতে ধরিয়ে দিলেন ছোট একটি অ্যালবাম। সাত-আটটি ছবি- সবগুলোই ঝাপসা। বোঝা যাচ্ছিল খুব সাধারণ ক্যামেরায় তোলা। আমি বললাম, ছবিগুলো তো ভালো হয়নি। বিজ্ঞপ্তিটিই রাখছি। ভদ্রলোক নাছোড়বান্দা- ছবি যেতেই হবে। কিছুটা তার পীড়াপিড়ি আর বাকিটা ওঠার তাড়ায় একটি ছবি রাখি শেষমেশ। ভেতরে গিয়ে যথাস্থানে যথার্থ লোকের কাছে বিজ্ঞপ্তিটি দেই। ছাপা- না ছাপা তার এখতিয়ারে।

পরদিন ফোন। পরিচয় পেয়ে বুঝলাম, ফোনের অপরপ্রান্তে গতকালের সেই ভদ্রলোক। জানলাম, ছবি তো নয়ই, বিজ্ঞপ্তিটিও ছাপা হয়নি। আমি দুঃখ প্রকাশ করি। বুঝিয়ে বলি, বিজ্ঞপ্তির দায়িত্ব যার, তাকে আমি নিজের হাতে দিয়েছি। ভদ্রলোক কিছুতেই যেন বোঝেন না। রুক্ষ্ম কন্ঠ আরো রুক্ষ্ম হতে থাকে- আমার নিউজটা দিলেন না কেন? আমি এবারও বিনয়ের সঙ্গেই বলি, নিউজ দেওয়ার দায়িত্ব আমার নয়। ভদ্রলোকের স্বর চড়া হতে থাকে- আপনাদের তো ঠেলা না দিলে নিউজ দেন না। আমি কিন্তু অনেক উপর থেকে ঠেলা দেওয়ার ক্ষমতা রাখি।

কথা শুনে অবাকই হলাম। খুব কম মানুষকেই পত্রিকা অফিসে ফোন করে এই সুরে কথা বলতে দেখি। তবু বিস্ময় গোপন করে বললাম, আপনি কতো ওপর থেকে ঠেলা দিতে পারেন? ভদ্রলোক বললেন, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পারি। তখন বিএনপি সরকার মাত্র ক্ষমতায় গেছে। ঠেলা দেওয়ার ক্ষমতা হয়তো ভদ্রলোকের থাকতেও পারে। আমার বয়স কম তখন। মেজাজও সেরকমই। অগ্রপশ্চাৎ ভাবা হয় না। হুট করেই রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। বললাম, তাহলে আপনি ঠেলাই দেন। যতো ওপর থেকে পারেন, দেন। শুনে ভদ্রলোকের কণ্ঠও আরো চড়া হয়- আপনি কতোক্ষণ আছেন অফিসে? জানালাম, রাত নয়টা-দশটা পর্যন্ত থাকবো। ঠিক আছে বলে ঝটাং করে ফোন রেখে দিলেন।
সহকর্মী কাউকেই বলিনি কিছুক্ষণ আগের উত্তাপের কথা। সেই রাতে এগারোটা পর্যন্ত ছিলাম। ভদ্রলোক আর আসেননি।

সম্পাদকের 'জোর'
আরেক ভদ্রলোক কোন্ কুক্ষণে কাকে যেন কী এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গিয়েছিলেন। যথারীতি সেটি ছাপা হয়নি। এবারও ভদ্রলোকের রোষের শিকার আমি। এর পেছনে সহকর্মীদের কারো "সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র" আছে কিনা- ভেবেছি বারদুয়েক। নইলে শ্লার আমিই কেন বারবার! অবশ্য বিড়ি টানার জন্য ঘন ঘন বাইরে যেতে হলে প্রবেশপথে আগন্তুক কর্তৃক পাকড়াও হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই।
যা হোক একথা-সেকথার পর ভদ্রলোক হঠাৎ উত্তেজিত। বললেন, আসলে ভুল আমারই হয়েছে। আমি সরাসরি সম্পাদককে বলতে পারতাম। আমি কি উনাকে বলবো এখন?
এইবার আমার মাথা ঠাণ্ডা। ঘড়িটা একঝলক দেখে তাকে পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললাম, সম্পাদকের তো বের হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আপনি এখনই ফোন না করলে হয়তো উনাকে নাও পেতে পারেন।
কী যে হল, ভদ্রলোকের মুখের ভঙ্গি আচমকা কোমল হয়ে এল। আমি বুঝলাম, তিনি লাইনে চলে এসেছেন। রাজ্যের হতাশা নিয়ে অনুযোগের সুরে বললেন, এইগুলা ঠিক না ভাই। আমি বললাম, কোনগুলা? তিনি বললেন, এই যে নিউজ দিলে নিউজ ছাপা হয় না। আমাদের অফিসে আপনাদের পত্রিকা রাখি। অথচ আমাদের নিউজ আপনারা দেন না। আমি বললাম, আপনি তো ভাই এইটা বলতে পারতেন। বেশি জরুরি হলে অনুরোধ করতে পারতেন। কিন্তু আপনি সম্পাদককে ফোন করার কথা বললেন কেন?
মনে হল, বেশ লজ্জাই পেলেন তিনি। হাসলেন, হেসে ফেলি আমিও।

উপসংহার :
যে কোনো ঝুঁকি বা সাহস দেখানোর জন্য ব্যাচেলর জীবনের চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। 


'ঠেলা না দিলে তো নিউজ দেন না!'
ভদ্রলোক সম্ভবত কোনো এক এনজিও থেকে এসেছিলেন। অফিসে ঢোকার মুখে কে যেন আমার দিকে ইঙ্গিত করলেন। মধ্যবয়সী ভদ্রলোক এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। পরিচয়পর্ব সম্পন্ন হল, অতি বিনয় দেখাতে গিয়ে নেমকার্ড বিনিময়ও হল। ভদ্রলোক একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিতে চান, তবে এমনি-এমনি নয়, দিতে চান হাতে-হাতে, যেন মিস না হয়। তবে তাই হোক! কম্পিউটারে কম্পোজ করা দেড় পৃষ্ঠার বিজ্ঞপ্তি নিলাম। মানিকগঞ্জ কি নারায়ণগঞ্জে তাদের প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার শাখা কার্যালয় পরিদর্শন সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। মনে মনে বলি, কার্যালয় পরিদর্শনের আবার বিজ্ঞপ্তি কী? তাও এক মধ্যম সারির কর্মকর্তার পরিদর্শন! তবে সেটা মুখে বলার প্রশ্নই আসে না। আকার-ইঙ্গিতে তাকে বোঝাই যে, এটা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউজ! এর ফল হল বিপরীত। ভদ্রলোক প্রেস বিজ্ঞপ্তি তুলে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলেন না, এবার হাতে ধরিয়ে দিলেন ছোট একটি অ্যালবাম। সাত-আটটি ছবি- সবগুলোই ঝাপসা। বোঝা যাচ্ছিল খুব সাধারণ ক্যামেরায় তোলা। আমি বললাম, ছবিগুলো তো ভালো হয়নি। বিজ্ঞপ্তিটিই রাখছি। ভদ্রলোক নাছোড়বান্দা- ছবি যেতেই হবে। কিছুটা তার পীড়াপিড়ি আর বাকিটা ওঠার তাড়ায় একটি ছবি রাখি শেষমেশ। ভেতরে গিয়ে যথাস্থানে যথার্থ লোকের কাছে বিজ্ঞপ্তিটি দেই। ছাপা- না ছাপা তার এখতিয়ারে।

পরদিন ফোন। পরিচয় পেয়ে বুঝলাম, ফোনের অপরপ্রান্তে গতকালের সেই ভদ্রলোক। জানলাম, ছবি তো নয়ই, বিজ্ঞপ্তিটিও ছাপা হয়নি। আমি দুঃখ প্রকাশ করি। বুঝিয়ে বলি, বিজ্ঞপ্তির দায়িত্ব যার, তাকে আমি নিজের হাতে দিয়েছি। ভদ্রলোক কিছুতেই যেন বোঝেন না। রুক্ষ্ম কন্ঠ আরো রুক্ষ্ম হতে থাকে- আমার নিউজটা দিলেন না কেন? আমি এবারও বিনয়ের সঙ্গেই বলি, নিউজ দেওয়ার দায়িত্ব আমার নয়। ভদ্রলোকের স্বর চড়া হতে থাকে- আপনাদের তো ঠেলা না দিলে নিউজ দেন না। আমি কিন্তু অনেক উপর থেকে ঠেলা দেওয়ার ক্ষমতা রাখি।

কথা শুনে অবাকই হলাম। খুব কম মানুষকেই পত্রিকা অফিসে ফোন করে এই সুরে কথা বলতে দেখি। তবু বিস্ময় গোপন করে বললাম, আপনি কতো ওপর থেকে ঠেলা দিতে পারেন? ভদ্রলোক বললেন, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পারি। তখন বিএনপি সরকার মাত্র ক্ষমতায় গেছে। ঠেলা দেওয়ার ক্ষমতা হয়তো ভদ্রলোকের থাকতেও পারে। আমার বয়স কম তখন। মেজাজও সেরকমই। অগ্রপশ্চাৎ ভাবা হয় না। হুট করেই রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। বললাম, তাহলে আপনি ঠেলাই দেন। যতো ওপর থেকে পারেন, দেন। শুনে ভদ্রলোকের কণ্ঠও আরো চড়া হয়- আপনি কতোক্ষণ আছেন অফিসে? জানালাম, রাত নয়টা-দশটা পর্যন্ত থাকবো। ঠিক আছে বলে ঝটাং করে ফোন রেখে দিলেন।
সহকর্মী কাউকেই বলিনি কিছুক্ষণ আগের উত্তাপের কথা। সেই রাতে এগারোটা পর্যন্ত ছিলাম। ভদ্রলোক আর আসেননি।

সম্পাদকের 'জোর'
আরেক ভদ্রলোক কোন্ কুক্ষণে কাকে যেন কী এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গিয়েছিলেন। যথারীতি সেটি ছাপা হয়নি। এবারও ভদ্রলোকের রোষের শিকার আমি। এর পেছনে সহকর্মীদের কারো "সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র" আছে কিনা- ভেবেছি বারদুয়েক। নইলে শ্লার আমিই কেন বারবার! অবশ্য বিড়ি টানার জন্য ঘন ঘন বাইরে যেতে হলে প্রবেশপথে আগন্তুক কর্তৃক পাকড়াও হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই।
যা হোক একথা-সেকথার পর ভদ্রলোক হঠাৎ উত্তেজিত। বললেন, আসলে ভুল আমারই হয়েছে। আমি সরাসরি সম্পাদককে বলতে পারতাম। আমি কি উনাকে বলবো এখন?
এইবার আমার মাথা ঠাণ্ডা। ঘড়িটা একঝলক দেখে তাকে পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললাম, সম্পাদকের তো বের হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আপনি এখনই ফোন না করলে হয়তো উনাকে নাও পেতে পারেন।
কী যে হল, ভদ্রলোকের মুখের ভঙ্গি আচমকা কোমল হয়ে এল। আমি বুঝলাম, তিনি লাইনে চলে এসেছেন। রাজ্যের হতাশা নিয়ে অনুযোগের সুরে বললেন, এইগুলা ঠিক না ভাই। আমি বললাম, কোনগুলা? তিনি বললেন, এই যে নিউজ দিলে নিউজ ছাপা হয় না। আমাদের অফিসে আপনাদের পত্রিকা রাখি। অথচ আমাদের নিউজ আপনারা দেন না। আমি বললাম, আপনি তো ভাই এইটা বলতে পারতেন। বেশি জরুরি হলে অনুরোধ করতে পারতেন। কিন্তু আপনি সম্পাদককে ফোন করার কথা বললেন কেন?
মনে হল, বেশ লজ্জাই পেলেন তিনি। হাসলেন, হেসে ফেলি আমিও।

উপসংহার :
যে কোনো ঝুঁকি বা সাহস দেখানোর জন্য ব্যাচেলর জীবনের চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। 


মাহবুব মোর্শেদ আজকে আমাকে নিয়ে একটি গল্প লিখেছেন। তার গল্পটা আমার পছন্দ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কয়েকদিন আগে ঘটা একটা সত্য ঘটনার কথা বলি।

গত পরশু সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই আমাকে ফোন করলেন এক সুহৃদ। হাতেগোনা কয়েকজনের মধ্যে তিনি একজন, যিনি মোটামুটি অবগত ছিলেন আমি অপরবাস্তব-৩ সম্পাদনা করেছি। ফোন ধরতেই তিনি বললেন, "তুমি শেষমেশ আমাকে বোকা বানালে?" শুনে আমি অবাক। কী এমন ঘটল আবার! আমি বললাম, হঠাৎ এই কথা? সুহৃদ বললেন, অপরবাস্তব তুমি সম্পাদনা করো নাই। এটা করেছে তো আরেকজন, যার লোকালটক নিক ব্যান হয়েছিল। সে এখন (....) নিকে ব্লগায়, চিটাগাং কি কুমিল্লার ছেলে। কোন্ একটা পত্রিকার সাংবাদিক।

সুহৃদ যে নিকের কথা বলল, আমি ওই নিকটাকে প্রায়ই সামহোয়্যারে দেখি। কিন্তু ব্লগে কখনো তেমন করে কথাবার্তা হয়নি। তিনি ফেসবুকের কিছু কথোপকথনের টেক্সট আমার মেইলে ফরোয়ার্ড করলেন। তাতে অবাক হয়ে দেখলাম, "সম্পাদক" দাবি করে অপরবাস্তব বিষয়ে যিনি কথা বলছেন, ফেসবুক-সামহোয়্যারেও একই নিক তার, কিন্তু ওই লোক আমি নই। এটা দেখে আমার বেশ মন খারাপ হল। আমি চাইলে নিক ও মেইলের কথোপকথনগুলো প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু অন্য দিক থেকে আমার মনে হল, অপরবাস্তব যেহেতু ব্লগারদের বই। প্রতিটি ব্লগারেরই এই বইয়ের ওপর অধিকার আছে। এবং ব্লগারমাত্রই নিজেকে অপরবাস্তবের সম্পাদক বা অপরবাস্তবের লোক দাবি করতেই পারেন। এই যুক্তিটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হল এবং আমার মনটা ভালো হয়ে গেল।

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): banglablogবাংলা ব্লগbangladeshdhakabangla blogsomewherein...blogsomewhereinblogFusion5fusion fivebookoporbastoboporbastablocaltalk ;

প্রথম প্রকাশ

অনেক অনেক সিডি আছে আমার- প্রায় সবই ব্যক্তিগত ডাটা, কিছু আছে আলোকচিত্র আর কিছু গান। শেলফ থেকে সিডির প্রায় দুঃসহ ভার কমানোর একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি সম্প্রতি। অ-গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ফেলে দিচ্ছি প্রায় নির্বিচারে। ফেলতে ফেলতেই কিছু কিছু জায়গায় চোখ আটকে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হয়ে পড়ছি স্মৃতিকাতর। তেমনই এক অ-গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন ব্লগের পাতায় তুলে রেখে সিডিটা ফেলে দিলাম। সামনে এরকম আরো কিছু ব্লগে তোলার ইচ্ছে আছে।
যদিও এখন সবকিছু স্পষ্ট মনে করে উঠতে পারছি না। শুধু জানি, তখন আমার কথোপকথন লিখে রাখার একটা অভ্যাস (বদভ্যাসই নিশ্চিত!) ছিল। আর মনে আছে, এক বন্ধুর সঙ্গে এই কথোপকথনটি ইয়াহু মেসেঞ্জারে সম্ভবত হয়েছিল বছর আটেক আগে। কী সৌভাগ্য, সেই বন্ধু এখন লন্ডন থেকে ব্লগিং করেন। এই কথোপকথন হয়তো তার চোখে পড়বে। বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানীরাও এ থেকে কিছু উপাদান পেলেও পেতে পারেন!

পূর্বকথা
একদা একটি অসামান্য প্রেমের ইনিংস এগিয়ে চলছিল তুমুল বেগে। মুমু, যে এখন এক বিখ্যাত ক্রিকেটারের ঘরণী, তার সঙ্গে আমার বিয়ের ভাবনা ডালপালা মেলছিল সযত্নে। আর সেই সূত্রে জুলেখা চৌধুরীকে আমি খালা শাশুড়ি জ্ঞান করে যথাযোগ্য মর্যাদা দান করছি তখন। কোনো এক রাতের ১০ ঘটিকায় শুরু হওয়া কথোপকথনের সূচনাটা তাকে দিয়েই হয়েছিল-

কথোপকথন
(১০.০০-১১.৪৫ টা)

- বিরক্তিকর! ফোন ছাড়ছে না কেন? মুমুর মাও কি উনার মত? গল্প বাড়াইও না ... সিডনিতে ছোট খাট ফ্যাশন শো করলে ভাল ভাল প্রমোটর পাওয়া যেতে পারে।
আমার ভীষণ প্রস্রাব পেয়েছে, উঠতে হবে

- কষ্ট করে চেপে রাখো...ইটস আ চ্যাট
- শালির সাথে কথা বাড়াইও না.. মুমু আর মুমুর মা বাবা রাজি থাকলেই চলে..
- উনিও এক ফ্যাক্টর
- উনি আগে পরে বিরোধিতা করবেন। কারণ মুমু সুন্দরী, তার ঘনিষ্ঠ কারো জন্য চাইতে পারেন
- এজন্যই তার ছেলেকে অস্ট্রেলিয়ায় থাকার জন্য বলছি
- দেখছি, তুমি অনেক বড় ক্রিমিনাল
- এটা তো নতুন কথা নয়
- আই উইশ ইউর সাকসেস। পারবে আশা করি।
- এখন দ্বিতীয় ওয়াইফের জন্য প্রার্থনা করো খাস দিলে
- হু রিম্পা? না অন্য কেউ...
- সাবরিনা।
- বিপদে পড়োনা, সালাম করতে করতে মরে যাবে, আহসানও পাবে।
- বেটার টু ট্রাই ফর সাকিব’স শ্যালিকা। অবশ্য মোশাররফ বিপত্নিক হবে
- তাতেও কোনো সমস্যা নেই। মাজার থেকে ডেইলি টাকা তো পাবো। মুন্সি মিয়ার মেয়ের জন্য আগ্রহ নেই...
- সেখানে টাকার অনেক ভাগ হয়। এখন সেই দিনকালও নেই। তুমি তাদের অবস্থা দেখতে পাচ্ছো নিশ্চয়ই। মুন্সি মিয়ার মেয়ে তোমাকে লন্ডন নিয়ে যাবে।
- তুমি তো দেখি তার সাথে ভিলেজ পলিটিক্স করছো
- এখন অনেক রাত.. ১০.৫০ খোলা আকাশের নিচে...
- বাজারে আবার কিসের খোলা আকাশ?
- তুমিতো বিলের পাশে থাকো
- পাশে না অনেক দূরে


বিস্তর বাৎচিতের পর পল ডলিনস্কি নামের আমেরিকান ভদ্রলোক ইমেইলে জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশে এই প্রথম এবং এই শেষ। আর কখনো কোনো জিনিস পাঠাবে না তারা। বিশ্বের কোথাও নাকি এই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি তাদের কম্পানিকে।

ইত্যবসরে ডিএইচএল ওরফে হোমবাউন্ড প্যাকার্স থেকে আমাকে ফোন করে জানাল, আমেরিকা থেকে আমার নামে আসা এইচপি নোটবুকটি কাস্টমস থেকে ছাড়ানোর জন্য সবমিলিয়ে ৩৫ হাজার টাকা লাগবে। ওই লোক বারবার ‌'স্যার' ডাকছিল আমাকে। মাল্টিন্যাশনাল চাকরগুলো যাকে-তাকে স্যার ডাকে। পারলে পায়ে ধরে। সুতরাং এই সম্বোধনে গর্বিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং অংক শুনে আমি ঘেমে উঠি। ৫৫ হাজার টাকার মূল্যের (ঘোষিত মূল্য) নোটবুক আরো ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে খালাস করার মানেটা কী?

এক কলিগের পরিচিতজন- এই সূত্র ধরে আমি বিমানবন্দরে এক সহকারী কাস্টমস কমিশনারের অফিসে যাই। গিয়ে শুনি, উনি রাতে ডিউটি করেছেন, তাই আসতে উনার দেরি হবে। নিচতলার বারান্দায় নেমে অপেক্ষা করতে থাকি। মলিন মুখ দেখেই বোধহয় সিএন্ডএফ এজেন্সির এক লোক নিজে যেচে আমার সঙ্গে আলাপ শুরু করেন। কাহিনী শুনে উনি বললেন, কমিশনার ধরে আপনি কাজ করতে পারবেন না। আমাদের ফার্মের মাধ্যমে আসলে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে কাজটি তিন দিনের মধ্যে করে দেব। কোনো সমস্যা নেই। আমি বলি, কিন্তু আমার সমস্যা আছে। ৫৫ হাজার টাকার জন্য আরো ২৫ হাজার টাকা আমি কেন দেব? ওই লোক হাসে। আমাকে ভাবতে বলে অন্য দিকে যায়। আমি অপেক্ষা করতে থাকি কমিশনারের আশায়।

শেষমেশ কমিশনার আসেন দুপুর দুইটার দিকে। আমি তড়িঘড়ি ওপরতলায় উঠে পিয়ন মারফত নেমকার্ড পাঠাই। কিন্তু কতো লোক আসে যায়, আমারই শুধু ডাক আসে না। বহু পরে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মিলল। সব শুনে সহকারী কমিশনার বললেন, আপনি সিএন্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ওদের মাধ্যমেই আপনাকে আসতে হবে। এর বাইরে আমার পক্ষ থেকে আর কিছু করার সুযোগ নেই।

আমি তাকে অফিসের ব্যস্ততার কথা বোঝানোর চেষ্টা করি। বলি যে, কাস্টমসে প্রতিদিন আসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আজকের মধ্যে কাজটি করার ব্যবস্থা নিলে কৃতজ্ঞ থাকবো। শুনে উনি একটু হাসলেন। বললেন, প্রধান উপদেষ্টা এলেও তো এ ধরনের কাজ মিনিমাম দুই-তিনদিন লাগার কথা। আপনি মনে হয়, কাস্টমসের রুলস জানেন না।

আমাকে পাত্তা যে দিচ্ছেন না- বোঝা যায় পরিস্কার। তাছাড়া এ ধরনের কথার পর ওই অফিসে বসে থাকাও কষ্টকর। বেরিয়ে আসি রাজ্যের হতাশা নিয়ে। আবার সেই বারান্দা, আবার সিগারেট। সিএন্ডএফ এজেন্সির সেই লোক এগিয়ে এসে জানতে চায়, তার প্রস্তাব ভেবেছি কিনা। আমি বললাম, দেখি! ক্ষোভ জমা হচ্ছিল আগে থেকেই। মোবাইল বের করে একজনকে জানালাম সবকিছু। সে বলল, আমি আসছি কিছুক্ষণ পর। আপনি অপেক্ষা করেন।

সে আসল। এসেই সোজা উঠে গেল সেই সহকারী কমিশনারের কক্ষে। পিছন পিছন আমি। এবার কমিশনারের আরেক চেহারা- যেন বিনয়ের সাক্ষাৎ অবতার। কেউ একজন খবর দিয়েছে বোধহয়, কয়েকজন লোক নিয়ে সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছুটে এলেন সেই কক্ষে। আমার সেই লোককে বললেন, কী করতে হবে স্যার, বলেন। কোনো চিন্তা করবেন না।

দশ মিনিট পর লোহার বিশাল গরাদ (জেলখানার মতো) পেরিয়ে আমরা গেলাম কাস্টমসের গুদামের (?) দিকে। লোকজন দেখে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একটু হকচকিয়ে গেলেন মনে হল। আমার লোকটি তাকে বলল, স্পষ্ট নির্দেশের সুরে, এই কাজটি যতো দ্রুত সম্ভব করে দেন। কতোক্ষণ লাগবে? দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, আগামীকাল বিকেলের মধ্যে কাজ হয়ে যাবে। কোনো চিন্তা করবেন না। আমার লোক বলল, এক ঘন্টার মধ্যে কাজ করে দেন। কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেলেন কাস্টমস ভদ্রলোক। শুধু বললেন, আমি অবশ্যই চেষ্টা করবো। আপনি ভাববেন না।

আমাকে বসিয়ে আমার লোক চলে গেল। বলল, কোনো সমস্যা হলেই যেন ফোন করি। তা করতে হল না। কাস্টমস ভদ্রলোক সবার চিৎকার-চেঁচামেচি থামিয়ে নির্দেশ দিলেন, অন্য সব কাজ বন্ধ। আমাকে দেখিয়ে বললেন, উনার কাজটি আগে করো। বিস্ময়করভাবে চা-বিস্কুটও এল। ফাঁকে ফাঁকে আলাপ চললো নানা বিষয়ে। আমি যে কলেজে পড়তাম, সেই কলেজে ভদ্রলোকের বোন অধ্যাপনা করতো- এই তথ্য আবিস্কৃত হল। আবার "কাস্টমসে চাকরি করে সৎভাবে জীবনযাপন করা খুবই কঠিন"- এই ধরনের আধ্যাত্মিক আলাপও বাদ গেল না। মাঝখানে উনি ভ্যাট কি ট্যাক্সের একটি রশিদ দেখিয়ে বললেন, শুধু এই টাকাটা রাখছি। একদম মিনিমাম। আরো কমানো যায় কিনা দেখছি। কাকতালীয়ভাবে সেখানেই ডিএইচএল প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা। আমি তার পরিচয় পেয়ে একটু মুচকি হাসি।

দুই হাজার টাকা পরিশোধ করে, দুই ঘন্টা পর এইচপি নোটবুক নিয়ে যখন গাড়িতে উঠি, মনে তখন রাজ্যজয়ের আনন্দ। প্রগাঢ় স্বস্তিবোধ এসে ভর করে মনে। যদিও কাস্টমসকে এরপর আরো দুবার অস্বস্তিতে ফেলেছি আগের মতোই। সর্বশেষ কদিন আগে আমার ভাইয়ের জন্য একটি লেনোভো থিংকপ্যাড আনিয়েছি। ডিএইচএল-ফেডএক্সের মুখে জুতো মেরে দুহাজারের ওপরে উঠিনি কোনোবারই।

কুকুরের জন্য মুগুর লাগে। ভালোমানুষির দাম সেখানে নেই!

প্রথম প্রকাশ  |  দ্বিতীয় প্রকাশ


আবদুল মোনেম লিমিটেড হঠাৎ করেই একবার উৎসাহী হয়ে উঠল, ইয়ো ইয়ো নামের একটি খেলা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। ওদের কারো কারো মুখে এও শোনা গেল যে, এর মাধ্যমে তারা কিশোর-তরুণদের মাঝে ক্রীড়ানুরাগ ছড়িয়ে দিতে চায়। পরে দেখা গেল, কিসের কী! চায়না কি কোরিয়া থেকে চালানের পর চালান এল ইয়ো ইয়ো নামের অদ্ভূত এক লাঠিমভর্তি। প্রচারের তোড়ে কিশোর-তরুণরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল ইয়ো ইয়োতে। রাস্তায় পর্যন্ত হাঁটা যাচ্ছিল না। আড়ালে তখন কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়ে গেছে ইয়ো ইয়ো বণিকদের।

জন্মদিন পালনের রেওয়াজটাও অনেকটা সেরকমই মনে হয়। এখনকার কিশোর-তরুণরা যেন বেড়ে উঠছে শুভেচ্ছা-বণিক আর্চিস গ্যালারির ধরনেই। মননে তাদের হলমার্ক, সৃজনশীলতার ছিঁটেফোটা নেই। বুঝে কিংবা না বুঝে, জন্মদিনে-ভালোবাসা দিনে-পরিবেশ দিবসে তাদেরকে ইংরেজি পদ্যের রঙচঙা কার্ড কিনতেই হবে! কোন্ গর্দভের কবে জন্মদিন, ১০ এপ্রিল নাকি ২৩ ফেব্রুয়ারি, স্কুলবালকের ডায়রি ভরে ওঠে তার বৃত্তান্তে। উঠুক!

জন্মদিন-বাণিজ্যে আমার যে ঐতিহাসিক অবিশ্বাস, তাতে এতোটুকু চিঁড় ধরে না।

প্রথম প্রকাশ